
স্টাফ রিপোর্টার,কক্সবাজার
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ফাঁসিয়াখালী মৌজায় বি.এস. ১৪৭ নম্বর খতিয়ানের জমি নিয়ে নজিরবিহীন জালিয়াতি ও প্রতারণার খেলা চলছে। মসজিদের নামে দান করা জমি নিজেদের দখলে রাখতে এবং সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বাধাগ্রস্ত করতে ভুয়া ও অতিরিক্ত নামজারী খতিয়ান তৈরির এক চাঞ্চল্যকর তথ্য অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।
অভিযোগ উঠেছে, এই জালিয়াতি সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা স্থানীয় ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহেদুল মোস্তফা (শাহেদ)। দলীয় পদের প্রভাব খাটিয়ে তিনি ও তার সহযোগীরা ভিন্ন ব্যক্তির স্বত্ব দখলীয় জমি গ্রাস করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন এবং ‘ম্যাক্স’ কর্তৃপক্ষের চলমান উন্নয়ন কার্যক্রমে অনর্থক বাধা সৃষ্টি করছেন।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত নথি ও খতিয়ান পর্যালোচনায় দেখা যায়, ফাঁসিয়াখালী মৌজার বি.এস. ১৪৭ নম্বর খতিয়ানে মোট জমির পরিমাণ ২৫.৫৩ একর। এর মধ্যে মসজিদ, রাস্তা ও কবরস্থান বাবদ .২৮ একর বাদ দিলে অবশিষ্ট থাকে ২৫.২৫ একর। রেকর্ডীয় মালিকদের মধ্যে পারভিন আরা বেগম (রশিদ আহমদের মা) ও চেমন খাতুন (জামাল উদ্দিন, কামাল ও জালাল উদ্দিনের মা) বিগত ২৮.১০.১৯৭৫ ইংরেজি তারিখে ৪০৭৯ নম্বর রেজিস্ট্রিকৃত দানপত্র মূলে ‘সিকদারপাড়া জামে মসজিদ’কে জমি দান করেন।
অনুসন্ধানে সিন্ডিকেটের জমি আত্মসাতের দুটি ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে:
চিত্র ১ (রশিদ আহমদের অংশ): দানপত্র বাদ দিয়ে পারভিন আরা বেগমের অবশিষ্ট জমি থাকে .৯২৩১ একর। তার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে পুত্র রশিদ আহামদ চৌধুরী নিজ অংশ ও মাতা থেকে প্রাপ্ত অংশ মিলিয়ে মোট ১.২৮৩৫ একর জমির মালিক হন। এর মধ্যে তিনি এওয়াজনামা ও রেজি. কবলামূলে মোট .৫৩৩৪ একর জমি হস্তান্তর করেন। আইনত তার অবশিষ্ট জমি থাকে মাত্র .৭৫ একর। কিন্তু ক্ষমতার জোরে রশিদ আহামদ চৌধুরী বি.এস. ৪৪৪ খতিয়ানে ১.২০ একর, ৫৫৩ খতিয়ানে .২০ একর এবং ৪৪৯ নম্বর খতিয়ানে .৭০ একর সৃজন করে মোট ২.১০ একর জমির নামজারী করিয়ে নেন। অর্থাৎ, নিজের বৈধ প্রাপ্যতার চেয়ে ১.৩৫ একর অতিরিক্ত জমি ভুয়া খতিয়ানের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
চিত্র ২ (জামাল উদ্দিনের অংশ): অপর রেকর্ডীয় মালিক চেমন খাতুনের দানপত্র বাদে অবশিষ্ট ৩.৪৫ একর জমি তার মৃত্যুর পর তিন পুত্র প্রত্যেকে ১.১৫ একর করে প্রাপ্ত হন। এর মধ্যে পুত্র জামাল উদ্দিন ৩টি ভিন্ন কবলা দলিলের মাধ্যমে মোট ১.০০ একর জমি বিক্রি করে দেন। আইন অনুযায়ী তার অবশিষ্ট জমি থাকে মাত্র .১৫ একর। কিন্তু জামাল উদ্দিনের ওয়ারিশগণ জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে বি.এস. ৮৩০ নম্বর খতিয়ান সৃজন করে ১.২০ একর জমি নিজেদের নামে অন্তর্ভুক্ত করে। অর্থাৎ, এখানেও ১.০৫ একর অতিরিক্ত জমি অবৈধ খতিয়ানের মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মূল দাতা চেমন খাতুন ও পারভিন আরা বেগমের ওয়ারিশরা নিজেদের নামে অতিরিক্ত ও ভুয়া নামজারী খতিয়ান সৃজন করে রাখায় মসজিদ কর্তৃপক্ষ আইনগতভাবে তাদের নামে নামজারী করতে পারছে না। নিয়মানুযায়ী, মসজিদ কর্তৃপক্ষকে এই জালিয়াতি করা ওয়ারিশদের নামজারি খতিয়ান থেকেই জমি উদ্ধার করতে হবে।
এদিকে, বি.এস. ১৪৭ নম্বর খতিয়ানের অপর দুই রেকর্ডীয় মালিক দেলোয়ার হোসেন ও আহমদ হোসেনের প্রদত্ত জমি নিয়ে মসজিদ কর্তৃপক্ষ বি.এস. ২০১৭ দাগের অন্দরে .৩০ একর জমির নামজারী খতিয়ান সৃজন করেছিল। কিন্তু বর্তমান বন্দর সড়কের উন্নয়ন কাজের জন্য উক্ত বি.এস. ২০১৭ দাগের জমিটি সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণ করা হয়েছে এবং মসজিদ কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে সেই অধিগ্রহণকৃত জমির ক্ষতিপূরণের টাকা উত্তোলনের জন্য আবেদন করেছে। এর ফলে আইনত বি.এস. ২০১৭ দাগে মসজিদের আর কোনো জমি অবশিষ্ট নেই।
বি.এস. ১৪৭ নম্বর খতিয়ানের রেকর্ডীয় মালিক দেলোয়ার হোসেনসহ অন্যান্য অংশীদারদের ওয়ারিশদের কাছ থেকে বৈধ খরিদমূলে জমি প্রাপ্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি (লাগিয়ত) গ্রহণ করেছে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা ‘ম্যাক্স’। বর্তমানে সেখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘বন্দর সড়ক’ বা পোর্ট রোডের কাজের মালামাল সংরক্ষণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চেমন খাতুনের ওয়ারিশরা (যিনি মসজিদের সভাপতি সেজেছেন) এবং পারভিন আরা বেগমের ওয়ারিশ রশিদ আহামদ চৌধুরীর পুত্র মোহাম্মদ শাহেদুল মোস্তফা (শাহেদ) মসজিদ কমিটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ম্যাক্সের কার্যক্রমে অনর্থক বাধা সৃষ্টি করছেন। চেমন খাতুনের ওয়ারিশগণ বিএস ৮৩০ ও ৮৩১ নং খতিয়ানের বিএস ২০১২ ও ২০১৩ দাগে অতিরিক্ত অংশ খতিয়ান করায় মসজিদ ২০১৭ দাগে আইনগত স্বত্ব হারিয়েছে। অথচ তারা মসজিদের জায়গা নিজেদের খতিয়ান থেকে ফেরত না দিয়ে প্রতারণা করে আসছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শাহেদুল মোস্তফা বর্তমানে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় দলীয় পদের চরম প্রভাব খাটাচ্ছেন। জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা খতিয়ান আড়াল করতে এবং অন্য অংশীদারদের বৈধ জমি গ্রাস করার কু-মানসেই তারা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের কাজে নিয়োজিত ম্যাক্স কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছেন।
ভূমি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দলিলের চেইন এবং খতিয়ানের হিসাব অনুযায়ী রশিদ আহামদ চৌধুরী এবং জামাল উদ্দিনের ওয়ারিশরা যে অতিরিক্ত জমি নামজারী করেছেন, তা সম্পূর্ণ বেআইনি ও জালিয়াতি।
রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কাজ মসৃণ রাখতে এবং খতিয়ান জালিয়াতি চক্রের হাত থেকে মসজিদের সম্পত্তি ও স্থানীয়দের বৈধ জমি রক্ষা করতে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ ও এই ভূমিদস্যু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।
মন্তব্য করুন